Undelivered unfinished letter

একটা ঘর, ভরে আছে অসংখ্য চিঠিতে—যেগুলো লেখা, না-লেখা, আর কখনোই পৌঁছাবে না।
চিঠি কি শুধু কাগজ, নাকি হৃদয়ের ভাঁজ খুলে দেওয়ার এক নীরব চেষ্টা?
অপেক্ষা, অপ্রকাশ আরশব্দের ভেতরের দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত যাত্রা।
যে চিঠিগুলো পৌঁছায় না, সেগুলোই কি আমাদের সবচেয়ে সত্যি অনুভূতি বহন করে?
হয়তো এই লেখাটাও ঠিক তেমনই—একটা unfinished letter…

প্রিয়,
তুঁই,

পুরো ঘরটায় জানিস শুধু আর শুধুমাত্র এই প্রিয় ‘তুঁই’-কে লেখা চিঠিতে গিজগিজ করছে। এক কোণায় সামান্য উঁচু হয়ে এক অদ্ভুত ঢিপির সৃষ্টি হয়েছে। কী দারুণ, না! চিঠিপত্রের ঢিপি। উঁইয়ের ঢিপি দেখেছি, পিঁপড়ের দেখেছি, মৌমাছিদেরও দেখা বহুবার হয়েছে—কিন্তু, এই চিঠি?

চিঠি কী?
কী হয় চিঠি দিয়ে?

এত এত চিঠি লিখে কখন ফেললাম? ঘরের চেহারা পুরোপুরি বদলে গেল কীভাবে এক নিমেষে?

১০ দিন খরচ করা এই যোগাযোগ ব্যবস্থা ১ মিলিসেকেন্ডের ক্ষণিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কীভাবে এখনো সমানে সমানে টেক্কা দেয়? কীভাবে?

এই একমাত্র চিঠিতেই, আমার মতে, জীবনের সবচেয়ে বড়, বৃহৎ—বা একেবারে অসীম, অনির্দিষ্ট আকারের—অদ্ভুত এক প্রত্যাশা তৈরি হয় মনের গভীরে।

‘চিঠিটা তো হাতে নিয়ে বাড়ি চলে এলাম, তাঁর লেখাটাকে গ্রহণ করলাম। তাঁর ওপর আরও ভরসা চাপিয়ে বসলাম। এর প্রত্যুত্তরে আমি কী কী আশা করতে পারি?
কী আছে ওই চিঠিখানার মধ্যে?’

এই চিঠি লিখতে বসেই মিনিটের পর মিনিট (ঘণ্টার পর ঘণ্টা কখনোই বলব না) শব্দহারা হয়ে বসে থাকি। আঙুলগুলো একে অপরের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে—
‘এ যে এতগুলো শব্দ একসাথে ভাবছে, অনুভব করছে; কোনটার গুরুত্ব, অগ্রাধিকার বেশি?
কোন নির্দিষ্ট শব্দটার?’

“চিঠি কাগজের নয়, চিঠি হল হৃদয়ের ভাঁজ খুলে দেওয়া।”
(A letter is not paper—it is the unfolding of the heart.)
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

“অপেক্ষার প্রতিটি দিন যেন একটি না-পাওয়া চিঠির মতো।”
(Each day of waiting feels like an undelivered letter.)
— শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

“অনেক চিঠি লেখা হয় না, তবু তারা বাতাসে ভেসে থাকে।”
(Many letters are never written, yet they float in the air.)
— জীবনানন্দ দাশ

আমার কী মনে হয় জানিস, তুঁই?
ঐগুলো আমার নয়। আমি চুরি করে এনেছি। ওদের সবার কাছ থেকে সবটা ছিনিয়ে নিয়ে চলে এসেছি। আমি চিঠি চুরি করেছি।

শুধু একটিবার হৃদয়ের ভাঁজটা খুলে যাক—ফেরত দিয়ে দেবো। ক্ষমা চেয়ে নেবো। তাঁদের অপেক্ষাগুলোকে কেড়ে নিয়ে নিজের কাছে রাখার মতো অপরাধের ক্ষমা।

‘সামনে থাকলে আমরা মুখোশ পরে থাকি, দূরে থাকলে আমরা খুলে ফেলি।’

সত্যিই তো, একান্তে থাকার সময় কখনোই নিজের জন্য মুখোশের প্রয়োজন পড়ে না। আমি মুখোশ পরে নেই। ভাঁজ খুলে দেওয়ার অসংখ্য চেষ্টাগুলোর মধ্যে এটিও ওই একটা চেষ্টা।

জীবনানন্দ নাকি চিঠি লিখতেন না?
“… লেখা হয় না…”

লিখে ফেললেও, সেগুলোর বেশিরভাগই হয়ে পড়ে—না-পাওয়া চিঠি। Undelivered letter.

আর আমার—
কিছু কিছু unfinished letter…