Bus এর journey আমার খুব ‘প্রিয়’। সে যে ধরণেরই হোক—সে হোক হোলির ছুটিতে বাড়ি ফেরার তাগিদে ৪ ঘণ্টা লালগোলা প্যাসেঞ্জারে বহরমপুর এসে, তারপর স্টেট বাস ধরে মালদা রথবাড়ি অবধি বাসের journey; বা হোক হাওড়া থেকে মিনিবাস ধরে বোটানিক্যাল গার্ডেনের উদ্দেশ্যে যাত্রা, ফিরতি পথে দ্বিতীয় হুগলি সেতুর ওপর দিয়ে ঘরে ফেরা।
যেটা এই আজকাল খুব বেশ করেই হয়, সেটা হলো ই এম বাইপাসে বাসের journey। বিধাননগর স্টেশন থেকে সোজা বাইপাস ধরে চিংড়িহাটা অবধি—বাসের শেষ সিটে বসে সমস্তটা উপভোগ করাটা আমার খুব প্রিয়। জানালার পাশে বসতে পারাটা তো আবার privilege আমার কাছে।
জানালার ওপরের ঘষা আবছা হলুদ কাঁচের মধ্যে দিয়ে বাইরের পৃথিবীটার দৃশ্যগুলো দেখার সময় অনেকটাই মনোরম অনুভব হয়; অন্য এক পৃথিবীর অস্তিত্ব খুঁজে পাই। রাস্তায় অজস্র প্রাইভেট গাড়ির চকচকে রুফে সূর্যের আলোর প্রতিফলন দেখতে গিয়ে মনে হয়, যেন অজস্র ছোট ছোট সূর্যের অংশ সেই গাড়িগুলোরই অবিভেদ্য অঙ্গ।
University যাওয়ার পথে মাঝে বেশ কয়েকটা ভিন্ন রকমের স্টপেজ রয়েছে সেই রাস্তায়। তাদের মধ্যে একেবারে অন্যতম Apollo বাসস্টপ। স্টপের উল্টো দিকেই Apollo Multispeciality Hospital। General নয়, private হাসপাতাল—অথচ খুব বেশি ভিড়। হাসপাতাল যেরকমই হোক, মানুষের আনাগোনা এই ‘আধুনিক বর্তমান’ সময়ে অনেকটাই বেশি। বাসে ওঠা যাত্রীর ভিড় অর্ধেক হতে খুব বেশি সময় লাগে না; ওই নেমে যাওয়া অর্ধেক ভিড়ের গন্তব্যই হলো Apollo।
বাইপাস ধরে চিংড়িহাটা পেরিয়ে আরো অনেকটা এগিয়ে গেলে Science City, কিছুটা এগোলে আনন্দপুর—সেখানেই বিখ্যাত Fortis হাসপাতাল। তারপর কিছুটা গেলে আরো বিখ্যাত Ruby General Hospital। সব বাসের কন্ডাক্টর অন্য কোনো গন্তব্য স্টপেজের নাম মুখে নিক বা না নিক—“রুবি, রুবি, রুবি যাবে”—এই কয়েকটা শব্দ তাদের মুখে সবসময় শোনা যায়। প্রত্যেক স্টপেজেই মানুষের মুখে এক অন্যরকম উৎসুকতা—বাসের গায়ে বা বাসের কন্ডাক্টরের মুখে ‘রুবি’ শব্দটা আছে কি নেই, সেটা নিয়ে।
University যেতে পথের মাঝে দুটো elevated মেট্রো স্টেশন রয়েছে। আগেও জানিয়েছি, অন্যরকমের আর এক ভালো লাগার কথা এই overhead মেট্রো স্টেশন নিয়ে। স্টেশনের নিচে লাল সিগন্যালের সবুজ হওয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলো যখন একসাথে সবুজ আলোর নির্দেশে এগিয়ে যাওয়ার জন্য একনাগাড়ে হর্ন বাজাতে শুরু করে, সে ক্ষণিক মুহূর্তের কোলাহলটা খুবই আনন্দদায়ক মনে হয়। এম্বুলেন্সের সাইরেন যদি যোগ করা যায়, তবে ব্যাপারটা আরো পরিপূর্ণতা পায়। ই এম বাইপাসে এম্বুলেন্সের গন্তব্যের সংখ্যাটা অনেক বেশি।
বেলেঘাটা ক্রসিংয়ের দুধারে রয়েছে দুই ভিন্ন ধরণের হাসপাতাল। সল্ট লেক যাওয়ার পথে রয়েছে AMRI Hospital, আর ক্রসিংয়ের অন্যদিকে—মানে শিয়ালদহ যাওয়ার পথে—রয়েছে ID & BG Hospital, বেলেঘাটা। বেলেঘাটা ID-তেই প্রথম Covid ward চালু করা হয়েছিল। এটি গভর্নমেন্ট হাসপাতাল।
Apollo-র ঠিক আগের স্টপেজ Mani Square—“4 storied multidimensional bustling super speciality shopping mall”। ৪ তলা বিল্ডিং পুরোটাই বিলাসে ভর্তি। এই স্টপেজও বাসযাত্রীর অনেকটাই ভিড় কমিয়ে দিতে সাহায্য করে। ই এম বাইপাসের ধার ধরে পুরোটাতেই এরকম আরো অনেক বিলাসবহুল জায়গা চোখে পড়ে। সল্ট লেক স্টেডিয়ামের সামনে the Hyatt Regency, কিছুটা দূরে গেলেই খুব বিখ্যাত ITC Royal Bengal। রুবি আর Fortis-এর মাঝে রয়েছে Acropolis Mall। কতটাই না luxury, pleasure আছে সেইসব জায়গায়!
বিধাননগরের ওপর নাম উল্টোডাঙা। উল্টোডাঙাকে ঘিরেই অসংখ্য বাইপাসগামী যাত্রীর অবিরাম আনাগোনা। রেলওয়ে স্টেশন থাকায় ব্যস্ততা খুব বেশি—সবসময়ই। উল্টোডাঙায় শুধুমাত্র কয়েক নামীদামি হাসপাতাল বা shopping mall-এ যেতেই অনেকে আসে না। অনেকেই আবার আসে করুণাময়ী, বিকাশ ভবন, সিটি সেন্টার, TCS, Wipro ইত্যাদি জায়গায় যাওয়ার জন্য।
কারো যদি খুব বেশি দূরে যাওয়ার ইচ্ছে থাকে—হয়তো অন্য কোনো দূরের শহরে—উল্টোডাঙা হয়ে বিপরীত পথ ধরে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে পারে। কেউ কিন্তু এক জায়গায় এক বিন্দুর ন্যায় খুব বেশিক্ষণ থেমে নেই; সবাই দৌড়োচ্ছে—physically না হলেও mentally। কেউ কেউ আবার বেশি ভাড়া দিয়ে অফিস টাইমের সেই অতিরিক্ত ভিড় এড়ানোর জন্য অটো ধরবার চেষ্টা করছে। তবে সবাই যে ভিড় এড়াচ্ছে তা নয়; অফিসে পৌঁছতে লেট হবে বলে, বা হয়তো তার গন্তব্য শুধুমাত্র অটো করেই যাওয়া যায়—এরকমও হতে পারে।
কেউ কেউ এরকমও আছে—Uber, Ola বা Rapido ছাড়া তাদের আবার পথে এক পা-ও এগোনো সম্ভব হয় না। কলকাতার রাস্তায় AC বাসের দেখা পাওয়াটা কিছু সময় অন্তর অন্তর খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। আমার আবার AC bus-এ journey করা খুব বেশি পছন্দ নয়—করিই না বলতে গেলে। প্রথম কারণ অবশ্যই ভাড়া বেশি বলে। আর অন্য কারণ শোনালে লোকে আমায় ‘পাগল’ বলতে একটিবারও দ্বিধাবোধ করবে না—“Out of Sanity”।
AC বাসে একসাথে অনেক ভিড় করে সব স্টপেজের যাত্রীর দেখা পাওয়া যায় না; সবধরণের মানুষ একসাথে AC bus-এ ওঠে না। ওই বাসের জানালা ঘষা আবছা হলুদ রঙের নয়—পুরোটাই হালকা কালো কাঁচে আবদ্ধ। জানালা নেই, থাকলেও খোলা যায় না, বা বিভিন্ন কোম্পানির advertisement আটকানো; বাইরের পরিবেশ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। মেট্রো স্টেশনের নিচের সেই কোলাহল AC bus-এ চেপে কখনোই শোনা যায় না। সেই বাসের কন্ডাক্টরদের মুখে Apollo, Mani Square, Ruby, বেলেঘাটা—এইসব শব্দে ভরা চিৎকার থাকে না; ঝোলানো থাকে ডিজিটাল LED screen।
আমি ভালোবাসি খুব পুরোনো নয় অথচ হাজারো আঘাত খেয়েও এখনো ঠিক আরামে হাজার হাজার যাত্রীকে নিমেষে তাদের প্রত্যেকের গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছে যেই বাসটা। যেই বাসে আনন্দিত মনে বিলাসের আকাঙ্ক্ষায় shopping mall-এ যাওয়া যাত্রীর দেখা মেলে, দেখা মেলে হাসপাতালগামী যাত্রীর—যার মনে কিছু নেই, শুধু হাজার ধরণের চিন্তা আর বিষাদ ছাড়া। আর সেই বাসে দেখা মেলে আমার—আমার গন্তব্য আমার University।
একদিন গিয়েছিলাম University ছেড়ে আরো এগিয়ে নিউ গড়িয়া অবধি—যেখানে ই এম বাইপাসের শেষ, যেখানে কলকাতা শহরের ছাপটাও শেষ হয়ে যায়, আর শেষ হয়ে যায় বাসের ভিড়। বাকি কিছুই থাকে না পরে—কিছুই না। না থাকে আনন্দ, না কোনো দুঃখ।
সেদিন আমি শেষ অবধি গিয়েছিলাম—নিউ গড়িয়া স্টেশন। খুবই ফাঁকা জায়গা।
কোনো ভিড় থাকে না সেখানে—যাত্রার সব শেষে।
এই লেখাটা ২০২২ সালের—আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সময়কার এক টুকরো অনুভূতি, ডায়েরির পুরোনো পাতায় থেকে যাওয়া কিছু পর্যবেক্ষণ আর পথচলার স্মৃতি। আজ ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে ফিরে পড়তে গিয়ে মনে হয়, শহরটা হয়তো বদলেছে কিছুটা, আমিও বদলেছি; তবু ই এম বাইপাসের সেই বাসযাত্রা, জানালার আবছা হলুদ কাঁচ, আর শেষ সিটে বসে মানুষজনকে দেখে যেতে থাকা সেই ছেলেটা কোথাও এখনো রয়ে গেছে। এই লেখাটা সেই পুরোনো Sourab-এর চোখে দেখা কলকাতা—যে তখন শুধু শহরটাকে নয়, নিজেকেও বুঝতে শিখছিল।