ক্লাস ফাইভ

গতকাল ওই দুটো লাইন লিখেই অজানায় পাড়ি দিয়েছিলাম—অজানা, অচেনা এক জায়গায়। প্রতিটা দিন যে ভারী স্মৃতিগুলো এতটা ভাবায়, সেসব থেকে বহুদূরে। এখন আবার সেগুলোর বর্ণনা দেওয়ার উদ্দেশেই ফিরে আসা। কতটা পৃষ্ঠাজুড়ে ওগুলো জায়গা করে নেবে, সেটাই দেখার। এখনো আপাতত ভূমিকাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছি।

তবে, সবটা শুরু করার আগে এটা পরিষ্কার করে দিই—ভারী স্মৃতিগুলো থেকে দূরে বলতে কিন্তু স্মৃতিগুলোর পুরোটা থেকে দূরে নই। বরং এই বর্তমানে স্মৃতি মানেই যেন শুধু ভারী আর কঠিন স্মৃতিকেই বোঝানো হয়। হালকা স্মৃতিগুলোকে আমরা এতটাই তুচ্ছ ভাবি যে সেগুলো কখনোই ভারী স্মৃতিগুলোর বিরুদ্ধে জিততে পারে না, মনে জায়গা করে নেওয়ার ইচ্ছেটুকুও যেন রাখে না।

দূরে গিয়েছিলাম ঠিকই—অজানা হলেও সেগুলো ছিল আমার খুব কাছের, আমার অত্যন্ত কাছের মধুর হালকা স্মৃতি।

তবে কোনটা দিয়ে শুরু করবো, সেটা ঠিক করতেই আমার একটু কষ্ট হচ্ছে—এটাও বলে রাখা ভালো। এত কথা বলার পরেও লেখাটার অগ্রভাগটা ঠিকমতো গুছিয়ে প্রধান বক্তব্যে যেতে পারলাম না। তবুও লিখে যাচ্ছি—যাতে একটু বিস্তারে বলতে পারি।

ক্লাস ফাইভে ওঠার পর জীবনে বহু পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়ে, বহু অভ্যাস প্রথমবার আমাদের জীবনে পরিবারের নতুন সদস্যের মতো বাকি সময়ের পুরোটাই আমাদের সঙ্গে জীবনযাপন করতে শুরু করে। প্রচুর ছোট ছোট জিনিস হঠাৎ করেই বড়ো, গুরুতর হতে শুরু করে।

গ্রাফাইটের কালো পেন্সিল আর সাদা রাবার—ওই দুটোকেও জীবন থেকে সরে যেতে দেখি। তার সঙ্গে আরও কত কিছু! ভুল করলে সেটাকে সংশোধনের সুযোগগুলোকেও হাতছাড়া হতে দেখি। ভুল করে সেটাকে ঠিক করা গেলেও অতীতের ভুলকে কখনোই মুছে ফেলা যায় না। সেগুলো থেকে মুক্তি একমাত্র পৃষ্ঠাটা ছিঁড়ে ফেলতেই, বা পুরো লেখাটাকেই আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া—ভালো-খারাপ সবটা সহ। তবে সেটা করে ফেলার সাহস আর হয়ে ওঠে না।

সুতরাং সমস্ত কাটাকাটি, ভুলভ্রান্তি নিয়েই জীবন এগিয়ে যেতে থাকে। জীবন এগিয়েছে—ক্লাস ফাইভ থেকে পেরিয়ে গেছে ১৫ বছর। অনেক কিছু ঘটেছিল, অনেক কিছু।

বাবা কাঠমিস্ত্রি বলে ছেলেও সেই দিকেই পা বাড়াবে—এই ধারণাটা সেই বছর থেকেই ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করেছিল। নাকি ঠাকুরদার মতো পায়ে রিকশার প্যাডেল ঘোরাবে, প্রতি সকাল-দুপুর, প্রতি রাত-সন্ধ্যে।

আমি আবার হয়তো ভারী স্মৃতিগুলোর চাপে চাপা পড়ে যাচ্ছি। দমবন্ধ হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। তবু হার মানব না। এখন আমার কর্তব্য হলো এই কয়েকটা পৃষ্ঠা ভর্তি করার সময়টুকুকে পূরণ করা। বাকি অনেক দায়িত্বে নিজেকে ছোট মনে হলেও, এই দায়িত্বটা মধুর—ঠিক হালকা স্মৃতিগুলোর মতো।

আরও এক যুগান্তকারী (আমার কাছে, হয়তো সবার কাছেই) পরিবর্তন, যা জীবনটাকেই বদলে দিল, তা ছিল প্রযুক্তিকে প্রথমবার কাছে থেকে অনুভব করার সুযোগ। প্রথমবার হাতে কম্পিউটার—মনিটর, কীবোর্ড, মাউস; Windows 7, Windows XP, MS Word, Paint, DOS…

এখনো ব্রাঞ্চে Command Prompt-এর ব্যবহার মাঝে মাঝেই পড়ে যাই। সেইসব হাতে-খড়ি তখন না হলে, আজ এই লেখার World Wide Web-এ অনবরত বিচরণ—এই WordPress, এই Aparahna, Apple iPad, Adobe Fresco, ChatGPT, Apple Music—কিছুই হয়তো এতটা কাছের হয়ে উঠত না।

সবটাই অন্ধকারেই রয়ে যেত; অজানাই থেকে যেত। হয়তো নিজের এই লেখাটাও জন্ম নিত না।

পুরাতন মালদা আর ইংরেজ বাজার শহরকে মহানন্দা আলাদা করে রেখেছে। মাঝে তখন দুটো সেতু ছিল, এখন তৃতীয়টাও এসেছে। তবু যে এক টাকার নৌকো পারাপার, সেটা আমাদের স্কুলের পথকে আরও ছোট করে দিয়েছিল।

শিক্ষা আর অশিক্ষার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মহানন্দা যেন মনে করিয়ে দিত—জীবনের পথে বাধার মধ্যেই তার সমাধান লুকিয়ে থাকে। এখনো সেই পারাপার চালু আছে; বহু ছাত্রছাত্রী এখনো স্কুলের পথে নৌকো থেকে নদীর জলে নিজের প্রতিচ্ছবিকে ধীরে ধীরে ভেসে যেতে দেখে।

এক টাকার সেই নৌকো পারাপার—এখন অবশ্য স্কুল ইউনিফর্মে পাঁচ, আর সাধারণে দশ টাকা হয়ে গেছে।

এখন আর শহরে যেতে পারাপারের সাহায্য নিতে হয় না—দুটো সেতুই ভরসা। তখন কখনো ভাবিনি যে প্রকৃতির নিয়ম থেকে শিক্ষা নিয়ে একটা আস্ত নদীর ওপর এত বড়ো ব্রিজ বানানো যায়—Bridge Engineering, Foundation Engineering, Soil Mechanics… এইসব বিষয়কে আয়ত্ত করার সুযোগও যে দশ বছর পরে আমার জীবনেই এসে পড়বে। যে নদী একদিন পার হতাম, একদিন তার ওপর সেতু কীভাবে দাঁড়ায় তা শিখছিলাম। 

আয়ত্ত অবশ্য ‘Highway Engineering’ ছাড়া বাকি কোনোটা ঠিকভাবে করতে পারিনি। তবুও সেটা যেন পরীক্ষার আগের রাতের একলা মুহূর্তের কাহিনী—এক রাতের। ১০০-র মধ্যে বোধহয় ৯২-টা answer করে এসেছিলাম।

ফাইভের ফাইনালে অঙ্কে ৯০-এর মধ্যে ১২ পাওয়ার ঘটনাটাও খুব স্পষ্টভাবে মনে আছে। প্রচুর খারাপ লেগেছিল। অজান্তেই তখনই হয়তো প্রথম বুঝেছিলাম—জীবনের বাস্তবতা কতটা কঠোরভাবে মনে আঘাত করতে পারে। 

এখনকার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল তখনকার জীবন—খুব নিয়মমাফিক। অন্তত সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সময়টা। ৫ নম্বর রোল হওয়ায় স্কুলের দ্বিতীয় তলার বাঁদিকের একেবারে কোণার ঘরটায়, সামনে দেওয়ালে ঠেকানো বেঞ্চের একেবারে শেষ প্রান্তে আমাকেই বসতে হতো। কথা কিভাবে কার সাথে বলতাম? সামনে দেওয়াল, ডানপাশে দেওয়াল—পেছনে তাকানোও যেন নিষিদ্ধ ছিল। নতুন, অজানা পরিবেশে ভয় খুব কাজ করত বলেই।

বর্ষার দিনগুলোতে খুব অসুবিধে হতো। আমি যে কোণায় বসতাম, সেখানেই সম্ভবত ছিল ঘর থেকে জল বেরোনোর দেওয়ালের ফুটোটা। জল জমে থাকত, বহুবার পা ভিজিয়েই বসে থেকেছি। বই-খাতা, ব্যাগ ভুলবশত নিচে পড়ে ভিজে গেছে—অনেকবার, অনেকবার। তবুও রোজ স্কুল যেতাম।

পকেটে থাকত ২ টাকা। ১ টাকা নৌকো পারাপার, আর বাকি ১ টাকা দিয়ে জলজিরা, আচার, পেপসি, বা এক টাকার দিলখুশ। দামি আইসক্রিম খেতে খুব ইচ্ছে করত বটে। কম ছিল সবকিছু, তবুও যেন কোনো অভাব ছিল না। 

সপ্তাহে একদিন এক পিরিয়ড লাইব্রেরি ক্লাস হতো। সৌমেন্দু ঠাকুর স্যার—নামটা এখনো মনে আছে। তিনি বাংলা সাহিত্যে গ্রাজুয়েট ছিলেন, এখন হয়তো গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন। দু’হাতে ভরা অসংখ্য রকমারি বই নিয়ে আসতেন। যার রোল যত আগে, সে ততো আগে বাকিদের তুলনায় বইগুলোর মধ্যে থেকে পছন্দের বইটা বেছে নিতে পারত।

ইতিহাস বইয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল—এটা ভেবেও মাঝেমাঝে অবাক হয়ে যাই। ফ্যাসিস্ট ইতালি, নাৎসি জার্মানি, ইহুদিদের নির্যাতন, ইউনাইটেড নেশনস, Axis–Allied, সোভিয়েত ইউনিয়ন—কত কিছুই না ছিল। 

পুরো পৃথিবী, যেন এক নতুন পৃথিবী, একেবারে সামনে খুলে গিয়েছিল।