“ওই?”
কোনো উত্তর পাইনি—তখন থেকে এখন প্রায় দশ মিনিটের বেশি হয়ে গেছে। এবার চেঁচিয়েই জিজ্ঞেস করলাম—
“ওই, শুনতে পাচ্ছিস?!”
— “কী হয়েছে, বল?”
“তোরটাই আসতে পারি? এতে জলের ছিটে আসছে। ভিজে যাচ্ছি। ভিজে গেছি।”
— “নাহ!”
“কেন তো?” — আমি জিজ্ঞেস করলাম, আগেরবারের মতোই চেঁচিয়ে।
— “একদম আমার ওপর চিৎকার করবি না।”
আসলে আমি ভিজছিলাম না; মনে মনে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর ফন্দি আঁটছিলাম। খুব বাজেভাবে ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হলো। বৃষ্টিটাও তো খুব জোরে পড়ছে না—ঝিরঝিরে এই বৃষ্টিতে হাঁটলেও মন্দ হতো না। কিন্তু কী জানি কেন, এখানে এভাবে থাকাটাই কিছুক্ষণের জন্য জরুরি মনে হচ্ছে—ঠিক এই ‘পুরোনো মসজিদের’ দেওয়ালে বহু কায়দায় বানানো কুঠুরির নিচে।
স্বাভাবিকভাবেই বৃষ্টিটা তখন জোর দিয়ে এসেছিল বলেই এভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছি দুজনে—আমি একটাতে, আর আমার থেকে দেড় হাত পুরু লালচে-বাদামি ছোট পুরোনো ইটের দেওয়াল পেরিয়ে সে।
বাড়ি থেকে ২৭ কিমি দূরে এই মসজিদকে সবাই ‘পুরোনো মসজিদ’ বলেই চেনে। মসজিদের নাম নেই। আশেপাশের জায়গাটার নামই ‘পুরোনো মসজিদ’। অদ্ভুত না? নামহীন নাম।
বাইরে মস্ত বড় বোর্ডে সমস্ত ইতিহাস খুব সুন্দরভাবে লেখা আছে। আমি কোনোদিন পড়ে দেখিনি। জানার ইচ্ছেবোধটা আসেনি কখনোই। আমার কাছেও এটি এখনও শুধুমাত্র ‘পুরোনো মসজিদ’। বোর্ডটা কিন্তু ASI-র। তাতে লেখা—
“Centrally protected monument under the jurisdiction of the Archaeological Survey of India. Constructed around 1375, it is considered one of the largest mosques in the Indian Subcontinent and is listed as a protected historical site.”
মনে পড়ল—হাইকোর্টে নাকি কী সব মামলা চলছে এটাকে নিয়ে।
এই যাহ! এখন তো দেখছি দূরে গাছগুলোর ছায়ার ফাঁকে ফাঁকে রোদের ঝলকানি উঁকি দিচ্ছে। বৃষ্টি তো পুরোপুরি শেষ! একটু বাইরের দিকে এগিয়ে আসতেই দেখতে পেলাম চারপাশটা চকচকে-ঝকঝকে। জুনের সূর্য এখন সবচেয়ে শক্তিশালী—মেঘেরা প্রচুর বর্ষিয়েও পারল না। তবু তারা নিজেদের ব্যর্থ মনে করে না; গর্বের সাথে সরে গিয়ে আলোকে পথ করে দেয়। গাছের ছায়াগুলোও পথ করে দেয়। আলোর সাথে আলোর কখনোই শত্রুতা হয় না—হয় অন্ধকারের সাথেই। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দুইটিরই একবার করে জয় হয়, আর পরেরবারেই পরাজয়।
“একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
পাঁচ মিনিট পর ‘কী?’—এর মতো একটা ক্ষীণ শব্দের আওয়াজ কানে এল বলে মনে হলো।
“বৃষ্টি শেষ হলো অনেকক্ষণ—আরও কিছুক্ষণ কি…?”
— “জানি না।”
হাতের মোবাইলটাতেই সময় দেওয়ার সিদ্ধান্তটাকে গ্রহণ করলাম। স্ক্রিনে এক গাদা deleted messages।
ও হ্যাঁ! গত রাতের লড়াইয়ের reparations চালাচ্ছিলাম।
War reparations …are payments or compensation that a losing country gives to the winning country (or affected countries) after a war to make up for the damage, loss, or suffering caused during the conflict.
আমার একটা প্রশ্ন আছে— যদি losing country compensate করে winning বা affected-কে, তবে তাকে কে compensate করবে? সে-ও তো—জয়ী না হলেও—ক্ষতিগ্রস্ত। Affected, too.
মোবাইলটাকে আবার পকেটেই পুরে দিলাম। হাতে কলমটার ঘোঁচা পেলাম। ঠিকই তো—বেরোনোর সময় কলম আর পকেটবুকটাও সঙ্গে নিয়েছিলাম। আমার বহুদিনের সঙ্গী।
ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দিনগুলোতেই শিয়ালদহে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার অভ্যেস হয়েছিল। ছবি তো আঁকা জানতাম না, তাই ভেবেছিলাম—শব্দ দিয়ে যদি ওই সময়গুলোকে ধরে রাখতে পারি। শুধু শব্দগুলোই নোট করতাম। ঠিক যেমন—একদিন শিয়ালদহ সাউথে দাঁড়িয়ে ছিলাম বলে অনেকরকম নাম জায়গা পেয়েছিল: যাদবপুর, পার্ক সার্কাস, বালিগঞ্জ। আরও দূরে ক্যানিং; তার বিপরীতে ডায়মন্ড হারবার, আর তাদের আগে বারুইপুর। একবার গড়িয়াতেও গিয়েছিলাম।
অনেক মুহূর্তের সঙ্গে এই কলম আর পকেটবুকটা খুব গভীরভাবে জুড়ে আছে। এই এখন—বৃষ্টিভেজা এই পুরোনো দেওয়ালের তৈরি খোপে আমি রয়েছি—এখানেও কেমন নিজের উপস্থিতিটা অনুভব করাল।
ওকে একটা চিরকুট পাঠিয়ে দেখা যাক।
দূর থেকে ছুড়ে—সম্ভবত ওর দিকেই গিয়ে পড়ল চিরকুটটা।
সে জানে—আমার সঙ্গীর বার্তাগুলো কেমন। সে আরও জানে—কোন কোন উপায়ে আমার কথা তার কাছে পৌঁছতে পারে, পৌঁছেই যায়। Google Pay, Gmail, মেইল—এই সব conversations-এ সত্যি যেন অন্যরকম অনুভব হয়।
কিভাবে বুঝলাম—সেটা না বললেও চলবে। সে চিরকুটটা হাতে তুলেছে। খুলেও ফেলেছে হয়তো এতক্ষণে।
ওপাশ থেকে একটু নড়াচড়ার শব্দ এল। তারপর চুপ।
All folds have already been unfolded.
ভেজা মাটির গন্ধটা তখনও বাতাসে। এখন আর কিছুই আড়ালে নেই—আঁধারেও না।